Share

আমি হাসনাইন রিজভী রহমান, আস্থা আইটি’র সিইও, যেভাবে কাজ করি

আস্থা আইটি-এর শুরুর দিকের গল্পটা আমাদের সাথে শেয়ার করুন, কীভাবে আস্থা আইটি-এর জন্ম হলো?
২০০৫ সালে অনার্স পাশ করে নেদারল্যান্ডস-ভিত্তিক একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে প্রোগ্রামার পদে জয়েন করি, এক বছর পরে আরও ভালো একটি আমেরিকান কোম্পানিতে চাকরি পাই। ২০০৭ সালে এই দ্বিতীয় কোম্পানিতে চাকরিরত অবস্থায় আমি বিদেশে মাস্টারস করবার সিদ্ধান্ত নেই, এবং সুইডেন চলে যাই। এভাবেই গোথেনবার্গ শহরে অবস্থিত চালমার্স ইউনিভার্সিটির মাস্টার অফ ইন্টারএকশন ডিজাইন প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়া, আর আমার স্বপ্নের দিকে আরেকটু এগিয়ে যাওয়া।

Why is this post in Bengali?
This post is primarily targeted to the Bengali-speaking audience who wants to follow the success stories of Bangladeshi companies, which are doing outstanding in the tech industry.

উচ্চ বেতনের ভালো একটা চাকরি ছেড়ে সুইডেনে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা আসলে আমার জন্য বেশ বাজে ছিল। এর পেছনে রয়েছে নানান পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণ। এর মধ্যে একটা “মজার” কারণ বলা যেতে পারে। আমি মাস্টারস করতে যাই ৭ বছরের হার্ডকোর প্রোগ্রামিং এর অভিজ্ঞতা নিয়ে। গিয়ে দেখলাম যেসব শিক্ষকরা আমার ক্লাস নিচ্ছেন তাদের টেকনিক্যাল জ্ঞান ও স্কিল দুটোই আমার থেকে অনেক অনেক কম। এর ফলে আমি দ্রুত হতাশ হয়ে পরি এবং ক্লাসে অনিয়মিত হয়ে যাই।

এর বদলে আমি তাই করা শুরু করি যা আমি সবসময়ই ভালোবেসে এসেছি – কোডিং। ডর্ম-রুমে বসে ফ্রিল্যান্সিং করতাম, আর বিভিন্ন কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দিতাম। একসময় বিশ্বখ্যাত অপেরা ব্রাউজার কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে যাই, কিন্তু দুর্ভাগ্য (কিংবা সৌভাগ্য!) বশত সেটি নরওয়েতে হওয়ায় আমার আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। কিছুদিনের মাঝে আমি একটি সুইডিশ কোম্পানির কাছ থেকে দুটো বড় প্রোডাক্ট বানিয়ে দেয়ার অফার পাই এবং কাজ শুরু করে দেই।

আর ঠিক তখনই আমার মাথায় ধাঁ করে একটা আইডিয়া খেলে যায়। এই প্রোডাক্ট দুটি যদি আমি বাংলাদেশে বসে বানাই, এবং বাজেটের কিছু অংশ দিয়ে বাড়তি কোডার ভাড়া করি – তাহলে সবদিক দিয়েই সবার লাভ! আমার লাভ আমি দেশে পরিবারের সাথে থাকতে পারছি, আর আমার ক্লায়েন্টের লাভ তারা দ্রুততম সময়ে কম খরচে তাদের কাজ পেয়ে যাচ্ছে।

অফশোর ডেভেলপমেন্টের সুফলের দিকগুলো আমি খুব সহজেই আমার ক্লায়েন্টকে বোঝাতে সমর্থ হই, এবং এর কিছুদিনের মাঝেই সুইডেনের পাট চুকিয়ে দেশে ফিরে আসি। বাংলাদেশে ফিরে এসে আমার এক অভিজ্ঞ প্রোগ্রামার বন্ধুকে ভাড়া করি এবং একসাথে প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্টের কাজ শুরু করি।

২০০৮ সালে আস্থা আইটি’র জন্ম ঠিক এভাবেই। তখন আমার মাত্র পঁচিশ বছর বয়স। প্রথম ক্লায়েন্টের কাজ সাফল্যের সঙ্গে করে দেয়ার পর রেফারেন্স হিসেবে বিভিন্ন দেশের আরও ক্লায়েন্টের কাজ আমরা পেতে থাকি, আমাদের কোম্পানি বড় হতে থাকে।

এর বহু বছর পর আমি স্টিভ জবসের “কানেক্টিং দ্য ডটস” খ্যাত বক্তৃতাটি শুনে অভিভূত হয়ে যাই, কারণ আমার জীবনেও ঠিক এমনটাই ঘটেছে! কৈশোর থেকে যদি আমার কোডিং এ পারদর্শিতা না থাকতো, আমি যদি ভালো একটি চাকরি ফেলে দিয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে সুইডেন না যেতাম, মাস্টারস প্রোগ্রামের মাঝে বোরড হয়ে পড়া না ছেড়ে দিতাম, ঘরে বসে ফ্রিল্যান্সিং শুরু না করতাম, সেখানে একটা বড় কাজ পেয়ে দেশে ফিরে আসার সাহসী স্বিদ্ধান্ত না নিতে পারতাম – তাহলে আজ আস্থা’র অস্তিত্ব থাকতো কি?

“আস্থা” নামটি কেনো?

প্রথম থেকেই আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলাম যে আমার কোম্পানির নাম হবে বাংলা। আমরা বাংলাদেশের বাংলাভাষী মানুষ। আমাদের প্রতিষ্ঠানের নাম ইংরেজি হতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, জাপানী প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের নিজস্ব ভাষায়, যেমন মিৎসুবিশি, হিটাচি, ইত্যাদি। তারা এইসব নাম নিয়ে সফল হতে পারলে আমরা কেনো পারবো না?

আমি খুঁজছিলাম একটা “জেনেরিক” বাংলা শব্দ যার সাথে প্রযুক্তির কোনো সম্পর্ক নেই। যেটাকে ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে অন্যান্য ধরণের ব্যবসাও চাইলে করা যাবে। আর সেভাবেই আস্থাকে খুঁজে পাওয়া।

ব্যবসার শুরুর দিকে কী কী সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে?

আমাকে বহু বহু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কোম্পানি প্রতিষ্ঠার সময়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিলো পুঁজির অভাব। পুঁজি নাই, তো অফিস নাই, অফিস নাই তো কর্মী আসবে কোথা থেকে? আমার মনে আছে আমি প্রথম জব ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম আমার বাড়ির ছাদের চিলেকোঠার ঘরে। ঘটনাটি আমার জন্য একই সাথে আনন্দের ও বিব্রতকরও বটে। যিনি ইন্টারভিউ দিতে এসেছিলেন তিনি আমার থেকে বয়সে বেশ বড়। ভদ্রলোক তার ভবিষ্যত কর্মক্ষেত্রের এহেন হাল দেখে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলেন। আমি তাকে ঠাণ্ডা মাথায় যুক্তি দিয়ে বোঝাতে সক্ষম হলাম যে এই চিলেকোঠার ঘর থেকেই খুব শীঘ্রই বড় একটা অফিস প্রতিষ্ঠা করতে পারবো যদি উনি আমার উপর আস্থা রাখেন। শেষমেশ উনি জয়েন করলেন।

বাংলাদেশের সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে প্রধান সমস্যাগুলো কী কী?

আমাদের আসলে অনেক সমস্যা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দক্ষ জনবলের অভাব। ব্যাপারটা একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যেতে পারে। আমাদের কোম্পানিতে আমরা ৩-৪ মাস পরপর ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দেই। প্রতিটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে ৫০০টি করে জব অ্যাপ্লিকেশন জমা পরে। দুঃখের বিষয় হলো, এই ৫০০ অ্যাপ্লিকেন্টের মধ্যে ইন্টারভিউ’এর জন্য ডাক পায় মাত্র ১০-১৫ জন। বাকিদের স্কিল-লেভেল এতোই খারাপ যে ইন্টারভিউতে ডাকাও সম্ভব হয় না। আর এ কারণে “কুইক হায়ারিং” খুবই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। আর্জেন্ট ভিত্তিতে দক্ষ কর্মী পাওয়া মোটামুটি অসম্ভব একটা ব্যাপার। মেধাবী ইঞ্জিনিয়ার খুঁজে পেয়ে নিয়োগ দিতে দিতে ১-২ মাস লেগে যায়।

মানবসম্পদ খাতে রয়েছে আরও কিছু সমস্যা। যেমন প্রফেশনালিজমের অভাব। আপনার গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের মাঝপথে টিমলিড চাকরি ছেড়ে দিয়ে অন্য কোম্পানিতে চলে গেল। কিছু করার নেই। এছাড়া আজকালকার তরুণ প্রোগ্রামাররা প্রযুক্তির গভীরে শিখতেও চায় না। কারণ গুগলে সব কোড পাওয়া যায়!

সমস্যা আরও আছে। একটি দেশের সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বড় ক্রেতা হওয়া উচিৎ দেশটির সরকার। কিন্তু আমাদের দেশে সরকারি কাজ পাওয়া যে কতটা ঝক্কির সেটা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। শক্তিশালী রাজনৈতিক চ্যানেল না থাকলে সরকারি কাজ পাওয়ার আশায় গুড়ে বালি।

যদি কোনো প্রোডাক্ট-এর বিজনেস মডেল ব্যর্থ হয় তবে তাদের কী করা উচিৎ? প্রোডাক্ট এর দিকে না যাওয়া নাকি আউটসোর্স করা?

ব্যাপারটা নির্ভর করে প্রোডাক্টটির প্রতি আপনার প্যাশন কতোটুকু তার ওপর। প্রোডাক্টটি যদি আপনার “সাইড প্রজেক্ট” হয়ে থাকে যা দিয়ে আপনি একটি এক্সপেরিমেন্ট করতে চেয়েছিলেন এবং যথেষ্ট অর্থ বিনিয়োগও করতে হয়নি, তাহলে এটি ব্যর্থ হলেও তেমন কিছু যায় আসে না।

কিন্তু এটি যদি হয়ে থাকে আপনার “ড্রিম প্রজেক্ট” যার পেছনে আপনি বহু পরিশ্রম, মেধা, সময় ও অর্থ ব্যয় করেছেন, সেক্ষেত্রে এটি ব্যর্থ হলে আমি বলবো – লেগে থাকুন। কেনো এটি ব্যর্থ হলো খুঁজে বের করুন। টিমের সাথে পোস্ট-মর্টেম সেশনে বসুন। বিজনেস মডেল বদলাতে হলে বদলান। এই লাইনে আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী কারা আইডেন্টিফাই করুন, এবং কীভাবে আপনার প্রোডাক্ট ওদেরগুলোকে টেক্কা দিতে পারবে ভাবুন।

প্রথম কয়েকটা ব্যর্থতায় হতাশ হবেন না। সফল উদ্যোক্তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মাটি কামড়ে পরে থাকার জেদ!

অন্যদিকে আউটসোর্স ইন্ডাস্ট্রি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা ব্যবসা। এটির ডাইনামিক্স অন্যরকম। মার্কেটিং পলিসি থেকে শুরু করে ডেভেলপমেন্ট স্ট্র্যাটেজিতেও রয়েছে নিজস্ব স্বকীয়তা। তাই প্রোডাক্টে ব্যর্থ হয়েই যে রাতারাতি আউটসোর্সিং শুরু করে দেয়া যাবে, ব্যাপারটা এমন না।

আপনার মতে ১ টা সফটওয়্যার কোম্পানি নিজস্ব প্রোডাক্ট থাকা কতটা জরুরি?

নিজস্ব প্রোডাক্ট থাকলে তো খুবই ভালো, তবে এটি খুব জরুরি না।

একটা ব্যাপার বুঝতে হবে। যেকোনো প্রোডাক্ট (সফটওয়্যার, গার্মেন্টস, অ্যাগ্রো, ইত্যাদি) মার্কেটে ছাড়তে গেলে সবচেয়ে আগে দরকার নিজের “লংটার্ম কমিটমেন্ট”। আপনি মূলত আপনার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে যুদ্ধে নামতে যাচ্ছেন। তাই যথেষ্ট পরিমাণে মার্কেট রিসার্চ করে মাঠে নামুন। মাঠ যদি ফাঁকাও থাকে, তারপরেও যে আপনার প্রোডাক্ট সফল হবে, এমন কোনো কথা নেই। হতে পারে প্রোডাক্টটি এতোই নতুন ধারণার, যে আপনার কাস্টোমাররা এটির জন্য এখনও রেডিই না!

প্রোডাক্ট বানানোর মানসিক প্রস্তুতি আর মার্কেট রিসার্চ করে ফেললে এরপর আপনার দরকার হবে মূলধন ও দক্ষ একটা টিম। সেটিও লম্বা সময়ের জন্য। প্রোডাক্ট বানানো হয়ে গেলে আপনাকে দলবল-সহ মার্কেটিংএ নামতে হবে, এবং পুরো ভেঞ্চারটি লাভজনক হতে হতে হয়তো ৬মাস থেকে ১বছর লেগে যাবে।

অন্যদিকে আপনার মূলধন যদি কম থাকে, তাহলে আপনার জন্য দ্রুত অর্থকরি বিজনেস মডেল হবে দেশি-বিদেশি ক্লায়েন্টের জন্য প্রজেক্ট করে দেয়া। এই মডেলের ক্যাশ-ফ্লো প্রোডাক্ট মডেলের চেয়ে অনেক বেশি ডায়নামিক।

তবে এটা সত্য যে, প্রোডাক্ট মানেই অ্যাসেট, আর একটি ভালো প্রোডাক্ট আপনার কোম্পানির ভ্যালু বাড়িয়ে দেবে বহুগুণ। কোম্পানির দীর্ঘ স্থায়িত্বের জন্য প্রোডাক্টের বিকল্প নেই।

আস্থা আইটি-এর বয়স তো প্রায় ৮ বছর, এতো দীর্ঘ পথ চলায় নিশ্চয়ই কোনো এমন সিচুয়েশান এ পড়তে হয়েছে যা প্রত্যাশিত ছিল না, সেটা আমদের সাথে শেয়ার করবেন কি, আর কীভাবে আপনি তা সমাধান করলেন?

আস্থা আইটির বয়স যখন ৪ তখন আমাদের সবচেয়ে বড় ক্লায়েন্ট কোম্পানিটি বিক্রি হয়ে গেলো। সেটি আমাদের জন্য বড় একটি ধাক্কা ছিলো কারণ ওরা আমাদের ৭০% কাজের সাপ্লাই দিতো।

যে কোনো ব্যবসায় এমন পরিস্থিতি আসতেই পারে। সেজন্য প্রস্তুত থাকাটা জরুরী। আমরাও ছিলাম। আমাদের সেভিংস ভালো ছিলো, এবং দ্রুত নতুন কাস্টোমার খুঁজে বের করতে সমর্থ হই। তবে হ্যাঁ, তখন ৪-৬ মাস বেশ ভয়ের মধ্যে কেটেছিল।

এই ৮ বছরে ঘটেছে এমন দুই-একটি আনন্দের গল্প বলুন।

আমরা ২০১৩ ও ২০১৪ সালে বেসিস কর্তৃক শ্রেষ্ঠ দশটি আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের একটি হিসেবে বিবেচিত হই ও অ্যাওয়ার্ড পাই। সেটা ছিলো আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের ও আনন্দের।

আপনি আপনার টিম মেম্বারদের আপনার সাথে দীর্ঘ সময় কাজ করার জন্য কীভাবে অনুপ্রাণিত করেন?

আমি নিজে একসময় প্রোগ্রামার ছিলাম বিধায় আমি খুব ভালো বুঝি টিম মেম্বাররা সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর কাছে কী আশা করে। আসলে আমি যখন কোম্পানি খুলি তখন নিজেকে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে এটি হবে এমন একটা প্রতিষ্ঠান যা অন্য কোম্পানির সমস্যাগুলো থেকে মুক্ত থাকবে।

সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট একটা বুদ্ধিবৃত্তিক পেশা, আর এই পেশায় যারা আসে তাদের বিশেষ কিছু চাহিদা আছে। আমরা সেগুলো পূরণ করার চেষ্টা করি।

  • ✓ যেমন, আমরা কখনও ওভারটাইম করাই না। কখনোই না। কেউ যদি নিজে থেকে বেশি সময় কাজ করে সেটা আমরা অ্যাপ্রিশিয়েট করি, কিন্তু ছুটির পর এক ঘণ্টার জন্যেও বেশি সময় কাউকে থাকতে বাধ্য করি না।
  • ✓ আমরা প্রচুর পার্টি করি, অফিসে এনে এবং বাইরে গিয়ে ভালো ভালো খাওয়া হয়, যা আমাদের স্ট্রেস থেকে মুক্তি দেয়।
  • ✓ এছাড়া, প্রতি বছর কোম্পানির খরচে আমরা ঢাকার বাইরে কয়েকদিনের জন্য সবাই মিলে ঘুরে আসি।
  • ✓ স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য আমাদের কিছু কর্মকাণ্ড আছে, যেমন স্কুলিং, সেমিনার ইত্যাদি। এছাড়া আমরা আমাদের কর্মীদের প্রতিদিন নতুন কিছু না কিছু শিখতে উৎসাহিত করি।
  • ✓ আমাদের রয়েছে অত্যন্ত স্বচ্ছ বোনাস ও ইনক্রিমেন্ট পলিসি।
সব মিলিয়ে আমাদের কাজের পরিবেশ অত্যন্ত ডেভেলপার-ফ্রেন্ডলি। আমাদের স্টাফ রিটেনশন রেট গড়ে ৩ বছর, যা আইটি কোম্পানি হিসেবে অসাধারণ। এমন অনেকবার হয়েছে যে আমাদের ছেড়ে কেউ অন্য কোম্পানিতে সুইচ করে ভালো না লাগার কারণে আবার ব্যাক করেছে।

উদ্যোক্তাদের বড় একটি সমস্যায় পড়তে হয় পার্টনার নির্বাচন করায়। এই বিষয়ে আপনার কোনো পরামর্শ আছে?

আমার যেহেতু পার্টনার নেই, তাই আমাকে এই সমস্যায় পড়তে হয়নি। তবে আমার মনে হয় ব্যবসায়িক ভিশন মিলে এবং নিজের পরিবারের মতো বিশ্বাস করা যায় এমন কারো সাথে পার্টনারশিপে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

আপনার মতে, আপনি কাকে উদ্যোক্তা বলেন আর কাকে ব্যবসায়ী?

নতুন একটি ব্যবসা খুললেন, আপনি এখন উদ্যোক্তা। কিছু বছর পর ব্যবসাটি দাঁড়িয়ে গেল, আপনি তখন ব্যবসায়ী।

এমন কোনো প্রজেক্ট বা প্রোডাক্ট আছে কি যেটি নিয়ে আপনি গর্ব বোধ করেন?

আমাদের সব প্রজেক্ট নিয়েই আমি গর্ববোধ করি।

কাজ করার সময় আপনি কোনো ধরনের গান বা কবিতা শুনতে পছন্দ করেন?

একেবারেই না। আমি কাজের সময় ধ্যানের লেভেলে চলে যাই। গান, কবিতা, বা যেকোনো ধরনের distraction খুবই অপছন্দ করি।

আপনার সময় বাঁচানোর সেরা শর্টকাট বা লাইফহ্যাক কী?

নিয়মানুবর্তিতা ও সময়ানুবর্তিতা। সময়ের কাজ সময়ে করা, এবং পরের জন্যে ফেলে না রাখাই হচ্ছে সময় বাঁচানোর সর্বোত্তম পন্থা। কর্মঠদের সময়ের অভাব নেই, শুধু অলসদেরই সময়ের অভাব।

আপনার সফলতার পেছনে কোন জিনিসটির অবদান সবচেয়ে বেশি?

ঈশ্বরের অনুগ্রহ। বাবা-মার আশীর্বাদ ও আমার বেড়ে ওঠায় তাদের পরিশ্রম। অত্যন্ত supportive ও ধৈর্যশীল একজন জীবনসঙ্গিনী। আমার স্বপ্ন, কোনো কিছুকেই অসম্ভব মনে না করার প্রবণতা, ও হার না মানার জেদ।

উদ্যোক্তা হিসেবে, কোন মানুষটির চিন্তা-ভাবনা আপনার কাছে ভালো লাগে?

এমন অনেক মানুষই আছেন যারা আমাকে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রভাবিত করেছেন। বিশেষ করে নাম বলবো কাজ সফটওয়্যারের সিটিও ওয়াহিদ চৌধুরি ভাই, ও সেলিসের সিটিও শাহ নেওয়াজ আলি তপু ভাই।

প্রতিদিন আপনার কাছে এমন কি মনে হয়, যে আপনি সবার থেকে আলাদা?

হ্যাঁ সেটা মনে হয়, এবং এটাও জানি যে সব মানুষই আসলে সবার থেকে আলাদা। আর এটাই মানবজাতির সবচেয়ে বড় শক্তি ও সৌন্দর্য।

আপনার প্রতিদিনকার কাজ সম্পাদন করার জন্য কোন ডিভাইসটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে থাকেন এবং কেনো?

আমার ল্যাপটপ, ডেস্কটপ আর মোবাইল। মূল কাজের জন্য ল্যাপটপ আর ডেস্কটপ। ইমার্জেন্সি কাজ ও ইমেইলিং এর জন্য মোবাইল।

প্রতিদিনের টু-ডু লিস্ট তৈরি করার জন্য কোন সফটওয়্যার/পন্থাটি আপনার কাছে সেরা মনে হয়?

আমি extensively Google Apps ব্যবহার করি। জিমেইল, গুগল ক্যালেন্ডার, ডকস, ড্রাইভ, স্প্রেডশীট, ইত্যাদি আমাকে একটা কমন প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সব কাজ গোছাতে ও সম্পাদন করতে সহায়তা করে।

তবে এর বাইরে আরও কিছু প্রোডাক্টিভিটি ও প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট টুল আমি ব্যবহার করি – যেমন বেইজক্যাম্প, স্ল্যাক ও ট্রেলো।

একজন বাংলাদেশি হিসেবে যানজট আমাদের নিত্য দিনের সঙ্গী। আপনি যানজটের সময়টাকে সদ্ব্যবহার করার জন্য কী করেন?

যানজটের মতো বিরক্তিকর মূহুর্তে মেজাজ খুবই খারাপ থাকে। সেসময় আমার পক্ষে ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করা সম্ভব না। তাই আমি তখন ফেইসবুক বা ইন্সটাগ্রাম চালাই, যা দিনের অন্যান্য সময়ে আমি খুবই কম ব্যবহার করি।

আপনার কাজের স্থানটি কেমন?

অফিস বা বাসা – দুই জায়গাতেই আমার কাজের স্থানটি একইরকম। একটা ডেস্ক, একটা কম্পিউটার, ইন্টারনেট কানেকশন। ব্যাস!

আপনার দৈনিক ঘুমানোর সময়সূচি কেমন?

আমি দৈনিক ৫-৬ ঘণ্টা ঘুমাই। রাত ২ঃ৩০ থেকে সকাল ৮টা।

একজন উদ্যোক্তার কোন তিনটি বই বা সিনেমা অবশ্যই পড়া বা দেখা উচিৎ?

“অবশ্যই” পড়া বা দেখা উচিৎ এমন কোনো আইন নেই। অনেক বই বা সিনেমাই আছে যা কাজের জন্যে অনুপ্রেরণাদায়ক।

যেকোনো জটিল পরিস্থিতিতে নিজের কাজ করার মানসিকতা ঠিক রাখার জন্য আপনি কী করেন?

প্রথমত, আমি মাথা গরম করি না।

দ্বিতীয়ত, আমি ভেবে বের করার চেষ্টা করি পরিস্থিতিটা জটিল রূপ নিলো কীভাবে? যেকোনো সমস্যার কারণ বের করা গেলে সমাধানও খুব সহজ হয়ে যায়।

তৃতীয়ত, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি সমস্যা যতই বড় হউক, সমাধান একটা আছেই। শুধু খুঁজে বের করাটাই বাকি। “কোনো সমস্যাই আসলে সমস্যা না” – এটি বেদবাক্যের মতো বিশ্বাস করলে স্ট্রেস কমে যায় অনেকখানি।

আমি প্রচুর বই পড়ি। প্রচুর মানে প্রচুর। আমার ৩০০০+ বই এর সুবিশাল ব্যক্তিগত লাইব্রেরি আছে। বই আমাকে মানসিক শক্তি দেয়।

বাংলাদেশের কিছু সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের সম্পর্কে বলুন যাদের সফলতার গল্প আপনার কাছে উল্লেখযোগ্য মনে হয়?

সবার আগে আমি যার নাম বলবো তিনি বিডিজবসের ফাউন্ডার ফাহিম মাশরুর ভাই। উনি বাংলাদেশের ওয়েব স্টার্টআপ সাফল্যের পথিকৃৎ।

দেশীয় প্রেক্ষাপটে rokomari.com ও একটি সফল এবং উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ।

তরূণ তথ্যপ্রযুক্তিকর্মীদের জন্য আপনার উপদেশ কী হবে?

তোমাদের পরিচয় তোমরা তথ্যপ্রযুক্তিকর্মী। তাই তথ্যপ্রযুক্তির একদম ভেতরে ঢুকে যাও। গভীর থেকে আরো গভীরে। স্কিল ও জ্ঞান বৃদ্ধি করো। প্রতিদিন কিছু না কিছু শেখো। নতুন টেকনোলজিগুলো দ্রুত আয়ত্বে নিয়ে এসো। তোমার অফিসে পুরোনো টেকনোলজি নিয়ে কাজ করতে হলেও, তুমি পিছিয়ে থেকো না। বাসায় বসে শেখো। প্রতিনিয়ত প্রোগ্রামিং সমস্যা সমাধান করো। Train your brain. নিজের ভালো লাগে এমন পেট প্রজেক্টে কাজ করো। সেটা হতে পারে ছোট ছোট টুল, অথবা কোন লাইব্রেরি।

অর্থের পেছনে ছুটবে না। তুমি যদি সেরা হও, অর্থই তোমার পেছনে ছুটবে।

যারা ভবিষ্যতের উদ্যোক্তা হতে যাচ্ছে তাদেরকে আরও উৎসাহিত করতে আপনার উপদেশ কী হবে?

আপনার উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে মূল কারণ যদি অর্থ বা খ্যাতি হয়ে থাকে, তাহলে আসলে না আগানোই ভালো। নতুন কোম্পানি চালু করা অনেকটা সন্তান জন্মদান ও পালনের মতো। প্রতিটা বাবা-মায়ের উদ্দেশ্য থাকে তাদের সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করা। ঠিক তেমনই প্রতিটি উদ্যোক্তার মিশন হতে হবে তাদের কোম্পানিকে প্রতিষ্ঠিত করা, এবং এটি যেন ব্যর্থ না হয় সেটি নিশ্চিত করা। শুধুমাত্র কোম্পানির প্রতি ভালোবাসা থেকেই এটা করতে হবে। অর্থ আসুক বা না আসুক। মাটি কামড়ে পড়ে থাকাটাই আসল। ডেডিকেশন যথেষ্ট পর্যায়ে থাকলে কোম্পানি সফল হবে, আর সেটি হলে অর্থ-খ্যাতি দুটোই আসবে।

ভিশন হতে হবে একদম স্বচ্ছ ও রিয়েলিস্টিক। ছোট ছোট মাইলস্টোন সেট করুন, একটা একটা করে সেগুলো নকআউট করুন।

অন্যান্য সফল উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপগুলোর মডেল ফলো করুন, এবং আপনার পরিস্থিতি মোতাবেক কাস্টোমাইজ করে নিন, নেটওয়ার্কিং বাড়ান। মার্কেটিং-এ ডেভেলপমেন্টের সমপরিমাণ গুরুত্ব দিন। সর্বোপরি, সবসময় পজিটিভ ও প্রোঅ্যাক্টিভ থাকুন।

আপনি কোন সময়টাতে কাজ করতে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন?

সব সময়! মানে কাজ হাতে থাকলে আমি সেটা শেষ না করা পর্যন্ত শান্তি পাই না। রাতের ঘুমের সময়টি ছাড়া বাকি যেকোনো সময় কাজ থাকলেই আমি সেটা করে ফেলি। যদিও অফিস টাইমে সবচেয়ে বেশি কাজ করা হয়।

গুণীজনদের কাছ থেকে পাওয়া এখন পর্যন্ত সেরা উপদেশ আপনার কাছে কোনটি মনে হয়েছে?

  • ✓ “There are many shortcuts to failure, but there are no shortcuts to true success.”
  • ✓ “Love what you do, and do what you love.”

আপনি এখন থেকে পরবর্তী ৫ বছরের মধ্যে আপনার কোম্পানি কে কোথায় দেখতে চান?

পরবর্তী ৫ বছরে আমরা এতো ভালো করতে চাই, যেন আমরা আমাদের অফিসের জন্য নিজস্ব একটি বিল্ডিং তৈরি করতে পারি। সেটি একতলা হউক বা ১০তলা।



লেখকঃ হাসনাইন রিজভী রহমান
সিইও, আস্থা আইটি গ্রুপ
http://hasnaeen.me
https://www.linkedin.com/in/hrrahman

Latest from Our Blog

Your-AI-agent-does-not-need-a-smarter-model
AIT--Blog-feature-Image-update
AIT-Partners-with-BANCAT-to-Support-Cancer-Patients-Through-Mosabbir-Alok-Nibash
Will-AI-replace-developers

Recommended for You

A-
Navigating-the-digital-frontier
Quantum-computing-in-software-development_28781290005
How-to-measure-the-ROI-of-your-software-investments_287569da3f9
Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.